Home / ইসলাম / এক নজরে পবিত্র শাহারুল রামাদান মাসের করনীয় আমলসমূহ

এক নজরে পবিত্র শাহারুল রামাদান মাসের করনীয় আমলসমূহ

রমজান মাসের আমলঃ রমজান হলো তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণের মাস। তাকওয়া অর্জনই রমজানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। রমজানের আমল করলে একটি কাজের জন্য ৭০ বা তার চেয়েও বেশি নেকি পাওয়া যায়। রমজান মাসে কয়েকটি আমলের কথা নিম্নে বলা হলোঃ

১। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত লাভের উদ্দেশ্যে সিয়াম সাধনা করাঃ

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, যখন রমজান মাস আসে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। অপর বর্ণনায় রয়েছে বেহেশতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয় এবং শয়তানকে শৃংখলিত করা হয়। অপর বর্ণনায় আছে, রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। [বুখারী ও মুসলিম]

২। মুখ ও জিহ্বাকে সংযত রাখাঃ হাদিসে এসেছে-

অবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কর্ম পরিত্যাগ করেনি, তার পানাহার ছেড়ে দেয়াতে আল্লাহর কোন কাজ নেয়। [মিশকাত : ১০৮৯, বুখারী]

৩। নিয়মিত তারাবীহর নামাজ আদায় করাঃ অনেক মানুষ, মসজিদে খতম তারাবী শেষ হবার পর মনে করেন তারাবী আর পড়তে হবে না। খতম তো শেষ করেছি। এটা ভুল ধারনা। আমাদেরকে যতোদিন রমজান মাস থাকবে, ততোদিন তারাবি ২০ রাকাত সালাত আদায় করতে হবে। কেউ ৮ রাকাত পড়লে,সে বাকি ১২ রাকাত তারাবি সালাতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। হাদিসে এসেছে-

“হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সা. রমজান মাসে বেশি নামাজ কায়েম করার জন্য উৎসাহ দান করতেন। [মুসলিম]

৪। কুরআন তিলাওয়াত করাঃ

নফল ইবাদতের মধ্যে সর্বোত্তম ইবাদত হলো কুরআন তিলাওয়াত করা। যেমন হযরত নুমান বিন বাশির রা. হতে বর্ণিত নবী করীম সা. ইরশাদ করেন –

“আমার উম্মতের সবচেয়ে উত্তম ইবাদত কুরআন তিলাওয়াত করা। [বায়হাকী, শুআবুল ঈমান :হা. ১৮৬৯, মুসনাদুস শিহাব : ১১৯৫]

৫। নিজে ইফতার করার পাশাপাশি রোজাদারদের ইফতার করানোঃ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত যায়েদ বিন খালেদ জুহানী রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করালো তাকে রোজাদারের অনুরূপ সওয়াব দান করা হবে। কিন্তু রোজাদারের সওয়াবের কোন কমতি হবে না”। [তিরমিযী : ৮০৭]

প্রতিদিন ইসলামিক মাসালা মাসায়েল পেতে ভিজিট করুনঃ ইসলাম আমার ধর্ম

৬। মিসওয়াক করাঃ

হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, “আব্দুল্লাহ বিন রবিআ রা. তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি নবী করীম সা. কে রোজা অবস্থায় অসংখ্যবার মিসওয়াক করতে দেখেছি”। [তিরমিযী: হা.৭২৫]

৭। সেহরী খেয়ে রোজা রাখাঃ

সেহেরী খাওয়া সুন্নত। সেহেরী খেয়ে রোজা রাখার মধ্যে বরকত নিহিত রয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে, ” আনাস বিন মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন- তোমরা সেহেরী খাবে। কেননা, সেহরীতে বরকত রয়েছে”। [বুখারী, মুসলিম]

৮। ইফতারের পূর্বে ও ইফতারের সময় দোয়া করাঃ

হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন ইফতার করতেন নিম্নের দোয়াটি পড়তেন, ” হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমার রিজিক দিয়ে ইফতার করছি। তুমি আমার এই রোজাকে কবুল কর। নিশ্চয় তুমি সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা”। [তাবারানী : ৮৪৫]

৯। শীঘ্রই ইফতারী করাঃ

হাদিস শরীফে বর্ণিতঃ “হযরত সাহল ইবনে সা’দ রা. বলেন, আল্লাহ রাসূল সা. বলেছেন, মানুষ কল্যানের সাথে থাকবে যতকাল তারা শীঘ্রই ইফতার করবে।” [বুখারী ও মুসলিম]

১০। খেজুর অথবা পানি দিয়ে ইফতার করাঃ

হযরত সালমান আমের রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ ইফতার করে সে যেন খেজুর দ্বারা ইফতার করে, কেননা এতে বরকত রয়েছে। যদি খেজুর না পায়, তবে যেন পানি দ্বারা ইফতার করে, এটি পবিত্রকারী। [আহমদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী]

১১। বেশি করে ইসতেগফার ও দোয়া করাঃ

এই রমজান মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত্রি হলো লাইলাতুল কদর। হাদিস মোতাবেক রমজানের শেষের দশদিন বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করার কথা বলা হয়েছে। এই জন্য যে মহান আল্লাহ দেখতে চান লাইলাতুল কদরের বরকত ও ফজিলত লাভের উদ্দেশ্যে তার কোন বান্দা বেশি ইবাদত করে।

রাসূল (সাঃ) এই শেষ দশকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তা নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূল সা. কে লাইলাতুল কদরের কথা জিজ্ঞাসা করলাম, আজ কি দোয়া পাঠ করব? তিনি বললেন নিম্নের দোয়াটি পাঠ করবে:

“হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল। তুমি ক্ষমাশীলতাকে ভালবাস। অতএব আমাকে ক্ষমা করো। [তিরমিযী : হা. ৩৫১৩, মুসনাদে আহমদ : ১/১৭১]

১২। মসজিদে এতেকাফ করাঃ

রমজানের শেষের দশদিনে এতেকাফ করা সুন্নত। পুরুষরা মসজিদে এবং স্ত্রীলোকেরা আপন ঘরে একটি স্থান ঘিরে নিয়ে তথায় এতেকাফ করবে। হাদিসে এসেছে-

“হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সা. রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন, যাবৎ না আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তাঁর পর তাঁর স্ত্রীগণও এতেকাফ করেছেন। [বুখারী ও মুসলিম]

১৩। বেশি বেশি করে নফল নামাজ আদায় করাঃ

হাদিস মোতাবেক রমজান মাসে একটি নফল ইবাদত করলে একটি ফরজ ইবাদতের সমান মর্যাদা পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে, হযরত আলী রা. বলেন, আমাকে হযরত আবু বকর রা. বলেছেন আর তিনি সত্য বলেছেন তিনি বলেছেন আমি রাসূল সা.কে বলতে শুনেছি যে, কোন ব্যক্তি গুনাহ করবে অতঃপর ওঠে আবশ্যকীয় পবিত্রতা লাভ করবে এবং নফল নামাজ পড়বে; তৎপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ]

১৪। বেশি করে আল্লাহর জিকির ও তাসবীহ-তাহলীল করাঃ

রমজান মাসে বেশি করে তাসবীহ পাঠ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্ঠা করতে হবে। মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে ? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তা তারা বার বার করে না” । [সূরা আল-ইমরান : ১৩৫]

১৫। রমজান মাসে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করাঃ

রমজান মাসের শেষের দশদিনের বেজোড় রাত্রিতে লাইলাতুল কদরের জন্য বেশি করে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং সারা বিশ্ববাসীর শান্তি, ক্ষমা ও স্থিতিশীলতার জন্য দোয়া করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, “লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম”। [সূরা কদর : ৩]

১৬। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করাঃ

রমজান মাসে এমন কিছু করা যাবে না যা শরীয়তপরিপন্থী। যেমন, রোজা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী দৈহিক মিলন করা যাবে না। রোজাদারহীন ব্যক্তি রোজাদারদের সামনে পানাহার করা যাবে না। সেই সাথে অশ্লীল ও অনৈতিক কার্যাবলী থেকে বিরত থাকতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন-” আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে না, তা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে”। [সূরা আন-আম : ১৫১]

১৭। মেয়েদের বিশেষ অবস্থার (হায়েজ) কারনে যতোগুলো রোজা বাদ পড়বে। সেগুলা পুনরায় যথাসময়ে আবার পূর্ণ করে দেওয়াঃ

রমজান মাসে মহিলারা হায়েজ অবস্থায় রোজা না রাখলে অথবা রোজা রাখার পর হায়েজ শুরু হলে তার জন্য পানাহার করা বৈধ। তবে অন্য লোকদের সামনে পানাহার করা উচিত নয়। দিনের বেলায় যদি ঋতু বন্ধ হয়ে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে দিনের বাকি অংশে রোজাদারের মতো পানাহার ও যৌনাচার বর্জন করা ওয়াজিব। -আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৪২০

এ প্রসঙ্গে হাদিসে আছে, উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো হায়েজ থেকে পবিত্রতার পর মহিলারা কি নামাজ ও রোজার কাজা আদায় করবে? তিনি বললেন, এ অবস্থায় আমাদের রোজার কাজা আদায় করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে নামাজের নয়।’ (সহিহ বোখারি ও মুসলিম)

রোজা কাজা করা আর নামাজ কাজা না করা সম্পর্কে উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) যা বলেছেন, সমস্ত উলামায়ে কেরাম তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন অর্থাৎ ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৮। সাধ্য অনুসারে প্রতিদিন দান – সদকা করাঃ কারন, দান – সদকা পাপী বান্দার উপর অাল্লাহর ক্রোধ দমন করে।

১৯। রোজা অবস্থায় টিভি দেখে বিনুদন নেওয়া, গান শোনা, অশ্লীল দৃশ্য দেখা, এসব সিয়াম সাধনার ব্যাঘাত ঘটায়। তাই এসব থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

২০। রোজা অবস্থায় স্বপ্ন দোষ হলেঃ

রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় স্বপ্নদোষ হলে আপনার রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ এটি ইচ্ছাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। এমনকি রোজা হালকাও হবে না, সওয়াবও কমবে না। কাজা বা কাফফারা কিছুই লাগবে না। সজ্ঞান রতিক্রিয়ায় রোজা ভঙ্গ হয়। ইচ্ছাকৃত হলে কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হয়। আর অনিচ্ছায় হলে শুধু কাজা আদায় করতে হয়। স্বপ্ন যেহেতু সজ্ঞান নয়; তাই স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভঙ্গ হবে না; স্বাভাবিকভাবেই রোজা পূর্ণ করবে। কাজা ও কাফফারা কিছুই প্রয়োজন হবে না। (ফাতাওয়ায়ে শামি)।

মুসলিম উম্মাহ’র কল্যাণে লেখাটি একে অপরের নিকট শেয়ার করুন। জাঝাখাল্লাহ্ খাইর।

Check Also

পৃথিবীর অজানা রহস্য

মায়ের লাশের সঙ্গে সন্তানের ৩০ বছর বসবাস! – অজানা রহস্য

পৃথিবীর অজানা রহস্যঃ পৃথিবীতে প্রত্যেক সন্তানকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তার কাছে সবচেয়ে আপন ব্যক্তি …